রাসুলুল্লাহ (সা) কি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন?

 

বিশ্বনবী (সা) কি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন?

ফেইসবুকে আবু ত্বহা আদনান ভাইয়ের একটা ভিডিও ভাইরালা হয়েছে। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন,

‘রাসূল (সা) ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, না জানি আমার কী হয়ে গেল? তিনি কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। যেখানেই উঠেছেন পাহাড়ে, তিনি মনে করেছেন, আমি পাগল হয়ে গিয়েছি! আমার কাছে এগুলো কী আসছে?’ নাউযুবিল্লাহ!

তার বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশটি পুরোই তার নিজের আইডিয়া। একজন নবীর শানে এভাবে কথা বলা সম্পূর্ণ আদবপরিপন্থী। আর প্রথমাংশে আত্মহত্যার চেষ্টা করার যে তথ্য তিনি দিয়েছেন, সে সম্পর্কে এবার বিশ্লেষণ করবো। কারণ, বিষয়টি একেবারেই অনির্ভরযোগ্য এবং পরোক্ষভাবে এই তথ্যটি প্রাচ্যবিদদের সমর্থন যোগায়।

সবার আগে নবীদের ব্যাপারে আমাদের আকীদা স্পষ্ট থাকতে হবে।

প্রথমত, তারা নিষ্পাপ। নবুওয়াতের আগে ও পরে কখনও তারা গোনাহে জড়িত হননি। এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ একমত। আত্মহত্যা যে একটি কবিরা গোনাহ এতে কারও সন্দেহ নেই।বিশেষত, বিশ্বনবীর পুরো জীবনটাই আদর্শ। নবুওয়াতের আগে এবং পরে। কাযী ইয়ায বলেন : উম্মাতে মুসলিমা এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছে যে, বিশ্বনবী শয়তানের সব ধরনের প্ররোচনা থেকে মুক্ত ছিলেন। বেহুশি, পাগলামি কখনও তার হয়নি। এমনকি তার মনে কখনও ওসওয়াসাও আসেনি।
ইবনে কাসীর বলেন, জ্ঞানীমাত্র ব্যক্তিই অবগত যে, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচে’ জ্ঞানী ও সর্বশেষ্ঠ বুদ্ধিমান ছিলেন।
তো একজন জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনই আত্মহত্যার পথে এগুতে পারেন না।

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, বিশ্বনবী (সা) ‘আমি কি পাগল হয়ে গেলাম’ এই ধরনের মনোভাবের শিকারও হননি কোনদিন। এটাই আমাদের আকীদা ও বিশ্বাস।

খায়বার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (সা) এক মুসলিম দাবিদার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, সে জাহান্নামী। তখন সাহাবায়ে কেরাম নবীজির কথা শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ, বাহ্যত সে লোকটি ছিলো একজন সাহাবী। যুদ্ধচলাকালীন এক সাহাবী নবিজীর কাছে ছুলে এসে বললো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি যাকে জাহান্নামী বলেছেন, সে তো প্রাণপন ইসলামের পক্ষে লড়ে যাচ্ছে। দুশমনের আঘাতে তার গোটা দেহ জর্জরিত হয়ে গেছে! তখনও নবীজি বললেন, সে জাহান্নামী! এবার সাহাবায়ে কেরাম ঘটনার শেষ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। আঘাতে যখন সেই লোকটির চরম কষ্ট হচ্ছিলো, তখন সে সইতে না পেরে তীরের ফলা দিয়ে আত্মহত্যা করে ফেলে। ঘটনা প্রত্যক্ষ করে সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহর কাছে ছুটে্ এলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার কথা আল্লাহ সত্যে রূপান্তর করেছেন। লোকটি আত্মহত্যা করেছে।
এরপর বিশ্বনবী বেলালকে ডেকে বললেন : বেলাল! ঘোষণা দাও, মুমিন ব্যতিত কেউ জান্নাতে যাবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনকে শক্তিশালী করবেন পাপিষ্ঠ লোক দ্বারা’। [সহিহ বুখারী : ৬৬০৬]

এই হাদিসে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, আত্মহত্যার কারণে লোকটিকে আল্লাহর রাসূল জাহান্নামী সাব্যস্থ করেছেন।

দ্বিতীয়ত, মন্দ কাজ দু’ ধরনের। এক. সত্তাগত মন্দ। দুই. সত্তাগত মন্দ নয়। তবে, সাময়িক কিছু কারণে, পারিপাশ্বিকতার বিচারে মন্দ সাব্যস্থ করা হয়েছে। যে সমস্ত জিনিস সত্তাগত মন্দ, সেগুলো পূর্ববর্তী কোন শরিয়তেও বৈধ ছিলো না। যেমন আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা। তদ্রুপ আত্মাহত্যাও সত্তাগত মন্দ কর্মের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, আত্মহত্যা আল্লাহর প্রতি নিরাশার চরম স্তর। যখন একজন মানুষ জীবন সম্পর্কে চরম হতাশায় ভোগে, তখনই এই পথে অগ্রসর য়। আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, এক ব্যক্তি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লো। রোগের তীব্রতা সইতে না পেরে শেষ পয্রন্ত আত্মহত্যা করে ফেললো। তখন আল্লাহ রাসূল (সা) বললেন : ‘তাহলে আমি তার জানাযা পড়বো না’।

এবার আসি আবু ত্বহা ভাইয়ের বক্তব্যের মূল অংশে। বিশ্বনবী সম্পর্কে তার মন্তব্য : ‘তিনি কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন’। তার এই বক্তব্যটি মূলত: বুখারী শরিফের একটি হাদিসের অংশ বিশেষ। হাদিসটি হলো :

وَفَتَرَ الوَحْيُ فَتْرَةً حَتَّى حَزِنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فِيمَا بَلَغَنَا، حُزْنًا غَدَا مِنْهُ مِرَارًا كَيْ يَتَرَدَّى مِنْ رُءُوسِ شَوَاهِقِ الجِبَالِ، فَكُلَّمَا أَوْفَى بِذِرْوَةِ جَبَلٍ لِكَيْ يُلْقِيَ مِنْهُ نَفْسَهُ تَبَدَّى لَهُ جِبْرِيلُ، فَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ، إِنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ حَقًّا، فَيَسْكُنُ لِذَلِكَ جَأْشُهُ، وَتَقِرُّ نَفْسُهُ، فَيَرْجِعُ. (صحيح البخاري : 6982- كتاب الرؤيا)

অর্থ : আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে তা হলো এই : কিছু সময় অহি বন্ধ থাকলো। এক পরযায়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষণ্ন হলেন। ফলে কয়েকবার তিনি পর্বত চূড়া থেকে আত্মহননের চেষ্টা করলেন। কিন্তু যখনই তিনি পর্বত চূড়ায় উঠে আত্মহত্যায় উদ্যত হন, তখনই জিবরীল তার সামনে প্রকাশিত হন এবং বলেন : হে মুহাম্মাদ! নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল। এভাবে তার হৃদয় প্রশান্ত হয়, মন স্থির হয়। এরপর তিনি ফিরে আসেন।

এই বর্ণনার উপর ভর করে প্রাচীন কাল থেকেই একদল ছিদ্রান্বেষী ও ইসলাম বিদ্বেষী এবং আধুনিক প্রাচ্যবিদরা প্রশ্ন তুলে যাচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে বিশ্বনবীর নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করা। তাদের সোজা সাপ্টা যুক্তিও রয়েছে। ইমাম বুখারি মুসলিমদের কাছে মান্যবর ব্যক্তিত্ব এবং তার গ্রন্থ মুসলিমদের কাছে কিতাবুল্লাহর পরই স্থান দেয়া হয়।

এবার আমরা এই বর্ণনার যৌক্তিকতা ও বিশ্বস্ততা যাচাই করবো।

মূলত: এটি দীর্ঘ হাদিসের অংশ বিশেষ। উক্ত হাদিসে অহি নাযিলের প্রাথমিক অবস্থা সবিস্তারে বর্ননা করা হয়েছে। অহি নাযিলের হাদিস ইমাম বুখারী তার সহিহ গ্রন্থে বেশ কয়েকবার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে এনেছেন। যেমন কিতাবের শুরুতে ‘কিভাবে অহি নাযিলের সূচনা হয়’ অধ্যায়ে; ‘তাফসীর অধ্যায়ে’; এবং স্বপ্ন অধ্যায়ে। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি কেবলমাত্র স্বপ্ন অধ্যায়ে উপরোক্ত অংশটুকু যুক্ত করেছেন; অন্য কোথাও উল্লেখ করেননি।

অবশ্য আরও কিছু হাদিসের গ্রন্থে এই অতিরিক্ত অংশটা রয়েছে। এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য হলো, ইমাম বুখারীসহ আরও যারা এই অংশটা তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য হলো : বক্তব্যটুকু অন্যান্য সহিহ হাদিসরে বিপরীতে হওয়ার কারণে বিশুদ্ধ নয়; এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা।

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেন : ‘আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে’ এই বক্তব্যের বক্তা হচ্ছে ইমাম যুহরী (রহ)। এগুলোকে ‘বালাগাতে যুহরী‘ বা ‘যুহরির কাছে যা পৌঁছেছে’ বলা হয়।
আমরা জানি ইমাম যুহরি একজন বিশিষ্ট তাবেয়ী। তিনি রাসূলুল্লাহর সাক্ষাৎ পাননি। তিনি সরাসরি এই অংশটুকু সংযুক্ত করেছেন। তার মাঝে ও নবীজির মাঝে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। যুহরি সেটা উল্লেখ করেন নি। তিনি কার থেকে শুনেছেন, সেটা বলেননি। সুতরাং এটি মুরসাল। মাঝের বর্ননাকারী কি বিশ্বস্থ না অবিশ্বস্থ? প্রশ্ন থেকেই যায়!

অপরদিকে, একই হাদিস বুখারি শরিফের অন্যান্য অধ্যায়গুলোতে এসেছে মুত্তাসিলুস সনদের সাথে। সেখানে কিন্তু এই অতিরিক্ত অংশ নেই। সুতরাং এই অংশ মুত্তাসিলুস সনদের মোকাবেলায় গ্রহনযোগ্য হতে পারে না।
কিন্তু ছিন্দ্রান্বেষীরা এই অর্ভিরযোগ্য হাদিসটাই উল্লেখ করে ইসলামের প্রতি আঙ্গুল তোলার প্রয়াস চালায়।

অহি নাজিলের প্রাথমিক অবস্থায় নবীজি কিছুটা চিন্তাগ্রন্থ ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে খাদিজা (রা) তাকে অভয় দেন এবং নবীজির প্রতি আল্লাহ কখনই অকল্যাণ করতে পারেন না, এ ব্যাপারে বিশ্বনবীর বিভিন্ন গুণাবলি উল্লেখ করেন।

অবশ্য সুরা আলাকের প্রথম ৫ আয়াত নাযিলের পর দীর্ঘ বিরতি হয়। সে সময় আল্লাহর রাসূল (সা) জিবরীলের দর্শনের জন্য উদ্গ্রীব হয়েছিলেন। এরইমধ্যে বেশ কয়েকবার সেই হেরা পর্বতে জিবরীলের সাক্ষাৎ পাওয়ার উদ্দেশ্যে গিয়ে থাকবেন। আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার পাহাড়ে আরোহণের এই বিষয়টাই কোন রাবি হয়তো নিজ ইজতিহাদে আত্মহত্যার প্রয়াস উপলব্ধি করে বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিফাজত করুন।

Al-Amin Sadek
20/12/21

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top